15.12.09

শকুন


সত্তরের দশক পর্যন্ত এদেশে শকুনের দল সহজেই চোখে পড়ত। নব্বইয়ের গোড়ায় মরা গরু খেতে শকুনের দল কোথা থেকে যেন হাজির হয়! ভাগাড়ে শকুন(Vulture) আর কাকের চেঁচামেচিতে গ্রামের লোকের ভিড় জমে যেত। লোকমুখে শোনা যায়, গরু মারা গেলে দূরদেশে কাক যায় শকুনকে খবর দিতে। আর ফেরার সময় ছোট্ট কাক দীর্ঘপথ পাড়ি দিতে না পেরে শকুনের পিঠে চড়ে বসে। এর কোনো বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা নেই। আসলে শকুন আকাশের অনেক উঁচুতে উঠে ডানা মেলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা উড়তে থাকে। এদের দৃষ্টিশক্তি এতই প্রখর যে, মাটিতে অথবা পানিতে ভেসে থাকা যে কোনো মরা জন্তু সহজেই দেখতে পায়। তবে শকুনের ঘ্রাণশক্তি নেই।


বাংলাদেশে ৫ প্রজাতির শকুনের মধ্যে সবচেয়ে বেশি দেখা যায় বাংলা শকুন। এদের বৈজ্ঞানিক নাম জেপস বেঙ্গালেনসিস(Gyps bengalensis)। এদেশে বেশি দেখা যেত বলেই ওদের নামের শেষে বাংলা শব্দটি চলে এসেছে। এখন গোটা পৃথিবীতেই এদের অবস্থা খুবই ভয়াবহ। সংখ্যায় দশ হাজারের বেশি হবে না। বাংলাদেশেও বাংলা শকুন এখন বিরল প্রজাতি। সব মিলে এদেশেও এদের সংখ্যা ২০০’র বেশি হবে না। তা-ও আবার বেশিরভাগই দেখা যায় সুন্দরবন এলাকায়। ঢাকার টঙ্গী এলাকায় একসময় শকুন দেখা যেত। এখনো দু’একটি দেখা যায় চিড়িয়াখানার আশপাশে।

এদেশ থেকে শকুন(Gyps fulvus) হারিয়ে যাওয়ার অন্যতম কারণ হলো প্রজননের জন্য আবাসস্থলের অভাব। এরা সাধারণত বট, শিমুল, দেবদারু, তালসহ বড় বড় দেশি গাছে বাসা বাঁধে। কিন্তু এসব দেশি গাছের আজ বড়ই অভাব। স্ত্রী শকুন বছরে মাত্র একবার একটিমাত্র ডিম পেড়ে বাচ্চা ফোটায়। কোনো কোনো সময় দুটি ডিমও দিতে পারে। ফলে এদের বংশবৃদ্ধির হারও খুবই কম। বিষাক্ত রাসায়নিকের কারণেও অনেক সময় এদের মৃত্যু হয়। বাংলাদেশসহ পুরো এশিয়ার গবাদিপশুকে ‘ডাইক্লোফেনাক’ নামের ওষুধ সেবন করানো হয়। গরু মারা যাওয়ার পরও এর কিছু কার্যক্ষমতা বজায় থাকে। মরা গরু খেলে ওষুধের ক্রিয়ায় শকুনের মৃত্যু হয়। বর্তমান সময়ে গরু মারা যায় কম বা গেলেও পুঁতে ফেলা হয়। ফলে দিন দিন এদের খাবারপ্রাপ্তি কমে এসেছে এবং এর ফলে ইতিমধ্যে হারিয়ে গেছে প্রায় ৯৯ দশমিক ৫ শতাংশ বাংলা শকুন।
পরিবেশের জন্য শকুন খুবই উপকারী একটি পাখি। হবিগঞ্জে এদের বাসা দেখতে পাওয়া খুবই আশার কথা। ভারতে শকুনের ‘ক্যাপটিভ ব্রিডিং’ শুরু হয়ে গেছে। আমাদের দেশ থেকে আগামী দশ বছরের মধ্যে সব শকুন হারিয়ে যাবে বলে বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন। কাজেই শকুনকে হারিয়ে ফেলার আগেই আমাদের সচেতন হতে হবে। বাড়াতে হবে এদের প্রজননক্ষেত্র অথবা ক্যাপটিভ ব্রিডিংয়ের মাধ্যমে এদের সংখ্যা বাড়িয়ে ছেড়ে দিতে হবে পরিবেশে। ৫ই সেপ্টম্বর আন্তর্জাতিক শকুন সচেতনতা দিবস। এবারই প্রথম এদেশে দিবসটি পালন করছে বাংলাদেশ শকুন গবেষণা ও সংরক্ষণ পোগ্রাম, ওরিয়েন্টাল বার্ড ক্লাব, বাংলাদেশ বার্ড ক্লাব, ডব্লিউআরসিসহ বেশ কয়েকটি সংগঠন’ সম্প্রতি এদেশে শকুনের কি অবস্থা তার একটি জরিপ পরিচালনা করে বাংলাদেশ শকুন গবেষণা ও সংরক্ষণ পোগ্রাম। তাদের গবেষণায় শকুন হারিয়ে যাবার ভয়াবহ এক চিত্র পাওয়া গেছে। বাংলাদেশ বার্ড ক্লাব ও বাংলাদেশ নেচার স্ট্যাডি এ্যান্ড কনজারভেশন ইউনিয়নও দীর্ঘদিন ধরে শকুনের জরিপ করে আসছে।
এরা মৃত প্রাণীর মাংশ খেয়ে থাকে। সাধারনত এরা অসুস্থ ও মৃতপ্রায় প্রাণীর চারিদিকে উড়তে থাকে এবং প্রাণীটির মরার জন্য অপেক্ষা করে।

শকুনের গলা, ঘাড় ও মাথায় কোনও পালক থাকে না।

উপাত্ত সংগ্রহ করা হয়েছে :
Prothom Alo
উইকিপিডিয়া

1 comments:

Iqbal Khan said...

ভাল একটি লেখার জন্য ধন্যবাদ

March 16, 2017 at 8:57 AM

Post a Comment